প্রয়াত প্রাণীবিজ্ঞানী কাজী জাকের হোসেন ছিলেন নাঙ্গলকোটের গর্ব

  • প্রফেসর ড. নূর জাহান সরকার

২০১১ সালের ২১ জুন প্রফেসর কাজী জাকের হোসেন ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। প্রফেসর কাজী জাকের হোসেন ১৯৩১ সালে ১ জানুয়ারি কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট থানার অন্তর্গত পাটোয়ার গ্রামের কাজী বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মরহুম মওলানা কাজী ওয়াইস উদ্দিন এবং মাতার নাম মোসাম্মৎ আখতারুন্নেসা। প্রফেসর কাজী জাকের হোসেন ছয় ভাইবোনের মধ্যে কনিষ্ঠতম। তিনি তার শিক্ষাজীবন শুরু করেন পিতার প্রতিষ্ঠিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণী ময়ূরী উচ্চ বিদ্যালয়ে এবং সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণী নাঙ্গলকোট এআর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে পাস করেন। নবম ও দশম শ্রেণী চাঁদপুর গণি উচ্চবিদ্যালয় থেকে পাস করেন। এরপর ১৯৫৩ সালে লাহোরের বিখ্যাত পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। তিনি প্রাণিবিদ্যা বিষয়ে এমএসসি পরীক্ষায় সর্বোত্তম স্থান অর্জন করে স্বর্ণপদকে ভূষিত হন। তিনি উক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিনস অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছেন। এরপর তিনি ১৯৬১ সালে জগদ্বিখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে। ১৯৫৩ সালে তিনি চাকরি জীবন শুরু করেন প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ২০১১ সালের ২১ জুন পর্যন্ত আমৃত্যু এ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক ও শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

কাজী জাকের হোসেন ২০০৮ সালের জুন থেকে আমৃত্যু ইমেরিটাস প্রফেসর হিসেবে সম্মানের সাথে গবেষণা ও শিক্ষকতা চালিয়ে গেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ৯ বছর পালন করেন। প্রফেসর হোসেন ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের নির্বাচিত ডিনের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ডিন পদে বহাল থাকা অবস্থায় সর্বপ্রথম জীববিজ্ঞান অনুষদে ছাত্রছাত্রীদের জন্য ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রবর্তন করেন ।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী মিউজিয়ামটি অন্য শিক্ষকদের সহায়তায় তিল তিল করে গড়ে তোলেন। তার মৃত্যুর পর পরই ২০১১ সালে তখনকার চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. নূর জাহান সরকার এর উদ্যোগে তার সম্মানে মিউজিয়ামটির নামকরণ করেছিল। ‘ইমেরিটাস প্রফেসর কাজী জাকের হোসেন মিউজিয়াম’।

জাকের হোসেন বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী শিক্ষা ও গবেষণার অগ্রদূত। তিনি ১৯৬৮ সালে এমএসসি পর্যায়ে প্রাণিবিদ্যা বিভাগে একটি নতুন শাখা সৃষ্টি করেন Ornithology হিসেবে এবং ১৯৭২ সালে উক্ত শাখার স্থলে Wildlife Biology বন্যপ্রাণী শাখায় রূপান্তরিত করেন। এ পর্যন্ত কয়েক শত বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞের সৃষ্টি হয়েছে এ শাখা থেকে এমএসসি ডিগ্রি নিয়ে। তৈরি হয় এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রিধারী।

স্বাধীন হওয়ার পরপরই প্রফেসর হোসেন বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী রংরক্ষণ আইনের চিন্তা করতে থাকেন এবং ১৯৭৩ সালে প্রণীত ‘বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অর্ডিন্যান্স’ তৈরির পেছনে তিনি তার অনন্য অবদান রাখেন। অচিরেই ১৯৭৪ সালে বন্যপ্রাণী রংরক্ষণ আইন সংসদে পাস হয়। এর পর থেকে তিনি তার চিন্তা, মনন ও কর্মে লেগে যান ‘বন্যপ্রাণী সরংরক্ষণ’ নামে একটি স্বাধীন বিভাগ সৃষ্টির প্রয়াসে যার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বন বিভাগের অধীনে ১৯৭৬ সালে একটি সংস্থার সৃষ্টি হয় ‘বন্যপ্রাণী সার্কেল’ নামে, যেখানে কয়েক জন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞের কর্মসংস্থানও হয়েছে। প্রফেসর হোসেনের মতে- বন্যপ্রাণী নিয়ে গবেষণা, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তথ্যভিত্তিক একটি সংস্থা গড়ে উঠবে, এবং একসময় বন বিভাগের অধীনেই একটি ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ শাখা’ গঠিত হবে যা পরে বন বিভাগের মতো একটি স্বাধীন ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ’ বিভাগে উপনীত হবে। এ সংস্থার অধীনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্যপ্রাণী শিক্ষায় ডিগ্রিপ্রাপ্ত বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন। এসব বিশেষজ্ঞ গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহের ভিত্তিতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় অনন্য অবদান রাখবেন। ১৯৭৪ সালে সরকার একটি বন্যপ্রাণী অ্যাডভাইজরি বোর্ড গঠন করেন যার একজন সদস্য হিসেবে প্রফেসর হোসেন কাজ করার সুযোগ পান এবং তার মতামত ও কর্মপন্থা নিয়ে কাজ করতে থাকেন।

তিনি লেগেই থাকলেন বিষয়টি নিয়ে। বিভিন্ন সূত্র খুঁজে সম্ভাবনা বের করে সর্বত্র কথা বলেছেন, লিখেছেন; চেষ্টা করেছেন বন্যপ্রাণী সার্কেলটির পুনর্জাগরণের জন্য অর্থাৎ ‘Wildlife conservation’ বিভাগের জন্য। একসময় তিনি চিন্তা করলেন, নিচ থেকে যখন একটি স্বাধীন সংস্থার অবয়ব তৈরি হলো না দেশের বন্যপ্রাণী রক্ষা ও তার যথাযথ ব্যবস্থাপনার জন্য, তখন উপর থেকে আসতে হবে। তিনি তার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সমিতি’ ও ‘পাখি সংরক্ষণ সমিতি’র কয়েকজন সদস্য নিয়ে ১৯৯২ সালের আগস্ট মাসে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এবং পরপরই প্রধানমন্ত্রী বরাবর বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে তুলে ধরলেন। তিনি বুঝাতে সক্ষম হলেন দেশে বন্যপ্রাণীর কতগুলো প্রজাতি রয়েছে, এই বন্যপ্রাণীর কতগুলো ইতোমধ্যে বিলীন হয়েছে, কতগুলো অচিরেই বিলীন হতে যাচ্ছে এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞই প্রয়োজন, প্রয়োজন একটি আলাদা বিভাগ। মহামান্য প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি উপলব্ধি করলেন। প্রধানমন্ত্রীর এ বিষয়ে উপলব্ধি সম্পূর্ণরূপে ইচ্ছায় প্রকাশিত হলো। সে দিনই বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে তথা টেলিভিশন, পত্রিকায় প্রচার করা হয় যে, বন বিভাগের মতোই ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ’ নামে একটি স্বাধীন বিভাগের সৃষ্টি হওয়া অতীব জরুরি এবং এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বন বিভাগে নির্দেশনাপত্র যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, বিষয়টি অদৃশ্য কারণে আর আলোর মুখ দেখেনি। সাম্প্রতিককালে বন বিভাগের অধীনে একটি ‘বন্যপ্রাণী গবেষণা কেন্দ্র’ গড়ে উঠেছে।

ঢাকা চিড়িয়াখানাটিও যাতে একটি আধুনিক চিড়িয়াখানায় রূপান্তরিত হয় সে জন্য অনেক যুদ্ধ মরহুম কাজী জাকের হোসেন করে গেছেন। প্রফেসর হোসেনের প্রবল ইচ্ছা ছিল, চিড়িয়াখানা থাকবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বন্যপ্রাণী বিভাগের অধীনে। প্রফেসর হোসেন ছিলেন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা এবং আজীবন প্রেসিডেন্ট, পাখি সংরক্ষণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা এবং আজীবন প্রেসিডেন্ট, চেয়ারম্যান, জাতীয় সাব কমিটি প্রজেক্ট, জাতীয় জাদুঘর, সদস্য ঢাকা চিড়িয়াখানা উপদেষ্টা কমিটি, সদস্য বন্যপ্রাণী উপদেষ্টা কমিটি, সদস্য জাতীয় পে-কমিশন, সদস্য অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি এক্সপিডিশন, ব্রিটিশ গায়ানা, লিডার এসিয়াটিক সোসাইটি এক্সপিডিশন, চট্টগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চল, সদস্য ট্রাস্টি বোর্ড, জাতীয় জাদুঘর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, তিন টার্ম, বাংলাদেশ প্রাণিবিজ্ঞান সমিতি প্রেসিডেন্ট। প্রফেসর হোসেনের তত্ত্বাবধানে ১৯ জন পিএইচডি, প্রায় ১০ জন এমফিল এবং বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রী এমএস, এমএসসি ডিগ্রিপ্রাপ্ত হয়েছেন। প্রফেসর হোসেন প্রায় ২০টি বইয়ের লেখক। তার ৮০টিরও বেশি বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রবন্ধ দেশী ও বিদেশী বিশ^খ্যাত জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়াও তিনি প্রায় চার শত সাময়িকী ম্যাগাজিন ও পত্রপত্রিকায় লিখে গেছেন। তার কলম কখনো থেমে থাকেনি, আমরণ লিখেছেন। মৃত্যুর দিনও তিনি পত্রিকায় লেখা পাঠান যা তার মৃত্যুর পরের দিন বিশেষ সম্মানের সাথে ছাপা হয়েছে। তিনি ভেবেছেন নিগূঢ়ভাবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় যে পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

লেখক: পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ, প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *